নদীভাঙন, সিকস্তি ও পয়স্তি: জমি বিলীন ও পুনরায় জেগে ওঠার আইন
নদীমাতৃক বাংলাদেশে ভাঙন ও চর জেগে ওঠা নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনা। প্রতি বছর নদী একদিকে বসতভিটা ও ফসলি জমি গ্রাস করে, আবার অন্যদিকে নতুন চর জেগে ওঠে। এই পরিবর্তনশীল ভূপ্রকৃতির কারণে জমির মালিকানা নিয়ে একটি স্বতন্ত্র আইনি প্রশ্ন তৈরি হয় — নদীতে বিলীন হওয়া জমির মালিকানা কি চিরতরে শেষ হয়ে যায়, না কি জমি জেগে উঠলে পুরনো মালিক তা ফিরে পান?
এই প্রশ্নের উত্তর দিতেই ভূমি আইনে সিকস্তি ও পয়স্তির ধারণা রয়েছে। সিকস্তি বলতে বোঝায় নদীভাঙনে বিলীন হয়ে যাওয়া জমি, আর পয়স্তি বলতে বোঝায় পলি জমে বা নদীর গতিপথ পরিবর্তনে পুনরায় জেগে ওঠা জমি।
সিকস্তি হলে রেকর্ডে কী ঘটে
জমি নদীগর্ভে বিলীন হলে তা আর ব্যবহারযোগ্য থাকে না এবং সেই জমির উপর ভূমি উন্নয়ন কর আদায়ও স্থগিত হয়। রেকর্ডে জমিটি সিকস্তি হিসেবে চিহ্নিত হয়। তবে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, সিকস্তি হওয়া মানেই মালিকের সব অধিকার তাৎক্ষণিকভাবে বিলুপ্ত হওয়া নয়।
আইনে একটি নির্দিষ্ট সময়সীমার ধারণা রয়েছে — জমি বিলীন থাকার পর নির্ধারিত সময়ের মধ্যে পুনরায় জেগে উঠলে মূল মালিক বা তাঁর উত্তরাধিকারীরা তা ফিরে পাওয়ার দাবি উপস্থাপন করতে পারেন। সেই সময়সীমা অতিক্রান্ত হলে জেগে ওঠা জমি সরকারি খাস সম্পত্তি হিসেবে গণ্য হয়।
পয়স্তি ও দিয়ারা জরিপ
নতুন চর জেগে উঠলে তার মালিকানা ও সীমানা নির্ধারণের জন্য বিশেষ জরিপ পরিচালিত হয়, যা দিয়ারা জরিপ নামে পরিচিত। সাধারণ জরিপ থেকে এটি আলাদা — এখানে মূল কাজ হলো নদীর গতিপথ পরিবর্তনের কারণে সৃষ্ট নতুন ভূমি চিহ্নিত করা এবং পুরনো রেকর্ডের সঙ্গে মিলিয়ে দেখা।
দিয়ারা জরিপে পুরনো মৌজা ম্যাপ ও খতিয়ানের সঙ্গে নতুন অবস্থা মিলিয়ে নির্ধারণ করা হয় — জেগে ওঠা জমি পূর্বের কোন দাগের অন্তর্ভুক্ত ছিল, এবং তা সিকস্তি হওয়ার পর কত সময় অতিবাহিত হয়েছে।
দাবি উপস্থাপনে যা প্রয়োজন
জেগে ওঠা জমিতে দাবি উপস্থাপনের জন্য মূলত প্রমাণ করতে হয় যে জমিটি বিলীন হওয়ার আগে দাবিদার বা তাঁর পূর্বপুরুষের মালিকানাধীন ছিল। সহায়ক নথি হিসেবে সাধারণত ব্যবহৃত হয়:
- সিকস্তি হওয়ার আগের খতিয়ান, বিশেষত সিএস ও এসএ
- সংশ্লিষ্ট সময়ের মৌজা ম্যাপ
- জমি বিলীন হওয়ার আগ পর্যন্ত খাজনা পরিশোধের দাখিলা
- মালিকানার দলিল ও বায়া দলিল
- উত্তরাধিকারসূত্রে দাবি হলে ওয়ারিশ সনদ
- স্থানীয় প্রবীণদের সাক্ষ্য
পুরনো ম্যাপের সঙ্গে নতুন জেগে ওঠা ভূমি মেলানো কারিগরিভাবে জটিল কাজ, কারণ নদীর গতিপথ পরিবর্তনে ভূপ্রকৃতির চিহ্নগুলোই বদলে যায়। এ কারণে এ ধরনের দাবিতে জরিপ প্রতিবেদনের ভূমিকা কেন্দ্রীয়।
চর এলাকার বিরোধের প্রকৃতি
নতুন জেগে ওঠা চর নিয়ে বিরোধ বাংলাদেশের উপকূল ও নদীতীরবর্তী এলাকার একটি পরিচিত সমস্যা। বিরোধের পক্ষ সাধারণত তিন ধরনের — পূর্বের মালিক বা তাঁদের উত্তরাধিকারী, স্থানীয়ভাবে দখল নেওয়া ব্যক্তিরা, এবং সরকার, যা খাস দাবি করে।
সরকারি নীতিতে জেগে ওঠা খাস চর ভূমিহীন পরিবারের মধ্যে বন্দোবস্তের অগ্রাধিকার স্বীকৃত। ফলে চর এলাকার জমি নিয়ে লেনদেনের ক্ষেত্রে বিশেষ সতর্কতা প্রয়োজন — জমিটি ব্যক্তিমালিকানাধীন না খাস, এবং বন্দোবস্তপ্রাপ্ত হলে তার শর্ত কী, তা যাচাই না করে লেনদেন ঝুঁকিপূর্ণ।
নদীভাঙনে জমি হারানোর পর রেকর্ড ও কাগজপত্র সংরক্ষণ করে রাখা গুরুত্বপূর্ণ। জমি পুনরায় জেগে উঠলে সেই পুরনো কাগজই দাবির একমাত্র ভিত্তি হয়ে দাঁড়ায়।