জমি পরিমাপের একক: শতক, কাঠা, বিঘা, একর ও পুরনো আনা-গণ্ডা-কড়ার হিসাব
জমি কেনাবেচায় ভুল বোঝাবুঝির একটি সাধারণ কারণ পরিমাপের একক। ঢাকা ও আশপাশের এলাকায় জমির হিসাব সাধারণত কাঠায় হয়, উত্তরাঞ্চলে বিঘায়, আবার দলিল ও খতিয়ানে লেখা হয় শতক বা একরে। চট্টগ্রাম ও নোয়াখালী অঞ্চলে কানির ব্যবহার প্রচলিত। পুরনো সিএস ও এসএ খতিয়ানে আবার আনা, গণ্ডা, কড়া, ক্রান্তি ও তিলের হিসাব দেখা যায়, যা বর্তমান প্রজন্মের অনেকের কাছেই অপরিচিত।
এই ভিন্নতার ফলে একই জমির পরিমাণ নিয়ে ক্রেতা ও বিক্রেতার হিসাব আলাদা হয়ে যেতে পারে। তাই লেনদেনের আগে কোন এককে কথা হচ্ছে তা স্পষ্ট করে নেওয়া এবং দলিলে ব্যবহৃত এককে রূপান্তর করে মিলিয়ে দেখা প্রয়োজন।
প্রচলিত এককের রূপান্তর
বর্গফুটকে ভিত্তি ধরে হিসাব করলে সব একক পরস্পরের সঙ্গে মেলানো সহজ হয়।
| একক | বর্গফুট | শতকে |
|---|---|---|
| ১ শতক | ৪৩৫.৬ | ১ |
| ১ কাঠা | ৭২০ | প্রায় ১.৬৫ |
| ১ বিঘা, অর্থাৎ ২০ কাঠা | ১৪,৪০০ | প্রায় ৩৩ |
| ১ একর | ৪৩,৫৬০ | ১০০ |
| ১ কানি | ১৭,৪২৪ | ৪০ |
| ১ গণ্ডা | ৮৭১.২ | ২ |
| ১ ছটাক | ৪৫ | প্রায় ০.১ |
| ১ অযুতাংশ | ৪.৩৫৬ | ০.০১ |
এখানে উল্লেখ্য, কানির পরিমাপ অঞ্চলভেদে ভিন্ন হতে পারে। প্রচলিত হিসাবে ১ কানি ৪০ শতক ধরা হলেও কোনো কোনো এলাকায় ভিন্ন হিসাব চালু আছে। তাই জমি কেনার আগে স্থানীয় প্রচলিত হিসাব যাচাই করে নেওয়ার রীতি রয়েছে।
কিছু সহজ সম্পর্ক মনে রাখলে দ্রুত হিসাব করা যায় — ১ একর সমান ১০০ শতক, ১ বিঘা প্রায় ৩৩ শতক, আর ১ একর প্রায় ৩ বিঘা।
পুরনো খতিয়ানের একক ব্যবস্থা
সিএস ও এসএ খতিয়ানে জমির পরিমাণ এবং মালিকানার অংশ — উভয়ই আনা-গণ্ডা-কড়া পদ্ধতিতে লেখা হতো। এই পদ্ধতিতে একক থেকে এককে বিভাজনের ধারা নিচের মতো:
- ১ কানি সমান ২০ গণ্ডা
- ১ গণ্ডা সমান ৪ কড়া
- ১ কড়া সমান ৩ ক্রান্তি
- ১ ক্রান্তি সমান ২০ তিল
জমির পরিমাণ বোঝাতে এই এককগুলো ব্যবহৃত হতো, আর মালিকানার অংশ বোঝাতে ব্যবহৃত হতো আনার হিসাব। সম্পূর্ণ সম্পত্তিকে ১৬ আনা ধরা হয় — অর্থাৎ ১৬ আনার মধ্যে ৮ আনা মানে সম্পত্তির অর্ধেক, ৪ আনা মানে এক-চতুর্থাংশ।
হিস্যা বা মালিকানার অংশ নির্ণয়
যৌথ মালিকানার জমিতে প্রত্যেক শরিকের অংশ খতিয়ানে ভগ্নাংশ বা আনার হিসাবে লিপিবদ্ধ থাকে। এই অংশকে বলা হয় হিস্যা। হিস্যা জানা থাকলে মোট জমির পরিমাণ থেকে প্রত্যেকের প্রাপ্য জমি বের করা যায়।
উদাহরণস্বরূপ, একটি খতিয়ানে মোট ১২০ শতক জমি রয়েছে এবং তাতে চারজন শরিকের প্রত্যেকের হিস্যা ৪ আনা করে লেখা আছে। ১৬ আনার মধ্যে ৪ আনা মানে এক-চতুর্থাংশ, অর্থাৎ প্রত্যেকের প্রাপ্য ৩০ শতক করে।
তবে হিস্যা অনুযায়ী প্রাপ্য জমির পরিমাণ জানা আর সেই জমি নির্দিষ্টভাবে চিহ্নিত হওয়া এক বিষয় নয়। বণ্টননামা দলিল সম্পাদিত না হওয়া পর্যন্ত যৌথ জমিতে প্রত্যেকের অংশ অবিভক্ত থাকে — অর্থাৎ নির্দিষ্ট কোন অংশটি কার, তা আইনত নির্ধারিত হয় না।
দলিল ও খতিয়ানে পরিমাণের গরমিল
দলিলে উল্লিখিত জমির পরিমাণ এবং খতিয়ানে লিপিবদ্ধ পরিমাণের মধ্যে পার্থক্য দেখা দেওয়া অস্বাভাবিক নয়। এর পেছনে কয়েকটি সাধারণ কারণ কাজ করে:
- বিভিন্ন জরিপে মাপের পদ্ধতি ও নির্ভুলতার পার্থক্য
- একক রূপান্তরের সময় হিসাবের ত্রুটি
- অংশ হস্তান্তরের সময় অবশিষ্ট জমির হিসাব হালনাগাদ না হওয়া
- নদীভাঙন, পলি জমা বা রাস্তা নির্মাণে জমির প্রকৃত পরিমাণ পরিবর্তন
- সরেজমিন দখল ও রেকর্ডের মধ্যে অসামঞ্জস্য
এ ধরনের পরিস্থিতিতে সরেজমিন মাপ এবং মৌজা ম্যাপের সঙ্গে মিলিয়ে দেখার প্রয়োজন পড়ে। প্রয়োজনে অভিজ্ঞ আমিনের মাধ্যমে মাপ করিয়ে নেওয়ার রীতি প্রচলিত।
সরকারি রেকর্ড ও রেজিস্টার্ড দলিলে উল্লিখিত পরিমাণই আইনগতভাবে চূড়ান্ত বিবেচিত হয়। মৌখিক হিসাব বা স্থানীয়ভাবে প্রচলিত ধারণা এর বিকল্প নয়।