মূল বিষয়বস্তুতে যান
মূল দলিল হারিয়ে গেলে করণীয়: বালাম বই, তল্লাশ ও সার্টিফাইড নকল

মূল দলিল হারিয়ে গেলে করণীয়: বালাম বই, তল্লাশ ও সার্টিফাইড নকল

Md Niaz Morshed ০২ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ০ বার পড়া হয়েছে সরকারি সেবা

মূল দলিল হারিয়ে যাওয়া বা নষ্ট হয়ে যাওয়া অনেকের কাছে আতঙ্কের বিষয়। প্রচলিত ধারণা হলো, দলিল হারালে জমির মালিকানাই বুঝি চলে গেল। বাস্তবে বিষয়টি এমন নয়। রেজিস্ট্রেশন ব্যবস্থার মূল উদ্দেশ্যই হলো হস্তান্তরের একটি স্থায়ী সরকারি রেকর্ড তৈরি করা — এবং সেই রেকর্ড সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে সংরক্ষিত থাকে।

দলিল রেজিস্ট্রেশনের সময় তার সম্পূর্ণ অনুলিপি হাতে লিখে বা মুদ্রণ করে যে বইয়ে সংরক্ষণ করা হয়, তাকে বলা হয় বালাম বই। মূল দলিল হারিয়ে গেলেও এই বালাম বই থেকে সার্টিফাইড নকল উত্তোলন করা যায়, এবং সেই নকল আইনগতভাবে মূল দলিলের কাজ করে।

প্রথম পদক্ষেপ

দলিল হারানোর বিষয়টি নিশ্চিত হলে সাধারণত যে পদক্ষেপগুলো নেওয়া হয়:

  1. স্থানীয় থানায় সাধারণ ডায়েরি করা, যাতে হারানোর বিষয়টি সরকারি নথিতে লিপিবদ্ধ থাকে।
  2. হাতে থাকা অন্যান্য কাগজ থেকে দলিল নম্বর, সন ও সাব-রেজিস্ট্রি অফিসের নাম সংগ্রহ করা।
  3. সংশ্লিষ্ট সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে নকলের জন্য আবেদন দাখিল করা।

সাধারণ ডায়েরির গুরুত্ব দ্বিমুখী। একদিকে এটি প্রমাণ রাখে যে দলিল হারিয়েছে, অন্যদিকে কেউ হারানো দলিল ব্যবহার করে প্রতারণার চেষ্টা করলে সেই ঝুঁকি কিছুটা প্রশমিত হয়।

দলিল নম্বর কোথায় পাওয়া যায়

নকলের আবেদনে দলিল নম্বর ও সন থাকলে প্রক্রিয়া দ্রুত হয়। মূল দলিল না থাকলেও নিচের কাগজপত্র থেকে এই তথ্য পাওয়া যেতে পারে:

  • নামজারির আদেশ বা ডিসিআর, যেখানে দলিলের সূত্র উল্লেখ থাকে
  • পূর্ববর্তী কোনো মামলার নথি বা আদালতে দাখিলকৃত কাগজ
  • ব্যাংকে বন্ধক রাখা হয়ে থাকলে ব্যাংকের নথি
  • দলিলের ফটোকপি, যদি কারো কাছে সংরক্ষিত থাকে
  • পরবর্তী কোনো দলিলে বায়া হিসেবে উল্লেখ

দলিল নম্বর অজানা থাকলে: তল্লাশ

দলিল নম্বর ও সন কোনোভাবেই জানা না থাকলে সূচি বইয়ে তল্লাশ করে দলিল খুঁজে বের করার ব্যবস্থা রয়েছে। সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে দুই ধরনের সূচি বই সংরক্ষিত থাকে — একটি দাতা ও গ্রহীতার নাম অনুযায়ী, অন্যটি সম্পত্তির অবস্থান অনুযায়ী।

তল্লাশের আবেদনে দাতা বা গ্রহীতার নাম এবং আনুমানিক সন উল্লেখ করতে হয়। যত বেশি বছরের তল্লাশ প্রয়োজন হয়, ফি ও সময় তত বাড়ে। সন সম্পর্কে ধারণা যত নির্দিষ্ট হয়, তল্লাশ তত সহজ হয়।

খরচের খাত

নকল উত্তোলনের খরচ একক ফি নয়, কয়েকটি খাতের সমষ্টি। প্রকৃত অঙ্ক নির্ভর করে দলিলের পৃষ্ঠা সংখ্যা ও তল্লাশের বছর সংখ্যার উপর।

খাত ভিত্তি
কোর্ট ফি আবেদনপত্রে নির্ধারিত মূল্যের কোর্ট ফি সংযুক্ত করতে হয়
তল্লাশ ফি যত বছরের তল্লাশ, সেই অনুযায়ী
পরিদর্শন ফি বালাম বই পরিদর্শনের জন্য নির্ধারিত হারে
নকল ফি দলিলের পৃষ্ঠা সংখ্যা অনুযায়ী
জরুরি ফি দ্রুত সরবরাহ চাইলে অতিরিক্ত, প্রযোজ্য ক্ষেত্রে

কোর্ট ফি আইন, ১৮৭০ অনুযায়ী আবেদনপত্রে নির্ধারিত মূল্যের কোর্ট ফি সংযুক্ত করার বিধান রয়েছে। ফি-এর হার সময়ে সময়ে পরিবর্তিত হয় বলে আবেদনের আগে সংশ্লিষ্ট অফিস থেকে প্রচলিত হার জেনে নেওয়ার রীতি প্রচলিত।

সার্টিফাইড নকলের আইনি মর্যাদা

সাব-রেজিস্ট্রি অফিস থেকে উত্তোলিত সার্টিফাইড নকল আইনত মূল দলিলের সমমর্যাদাসম্পন্ন। এটি আদালতে সাক্ষ্য হিসেবে গ্রহণযোগ্য, নামজারির আবেদনে সংযুক্ত করা যায়, এবং ব্যাংকে বন্ধকের ক্ষেত্রেও ব্যবহৃত হয়।

তবে একটি ব্যবহারিক পার্থক্য থেকে যায় — জমি বিক্রয়ের সময় ক্রেতা মূল দলিল দেখতে চাইতে পারেন, এবং মূল দলিল না থাকার ব্যাখ্যা দিতে হয়। এ ক্ষেত্রে সাধারণ ডায়েরির অনুলিপি ও সার্টিফাইড নকল একসঙ্গে উপস্থাপন করার রীতি রয়েছে।

পুরনো দলিলের ক্ষেত্রে বিশেষ বিবেচনা

অনেক পুরনো দলিলের ক্ষেত্রে বালাম বই সংশ্লিষ্ট সাব-রেজিস্ট্রি অফিস থেকে জেলা রেজিস্ট্রারের কার্যালয় বা রেকর্ড রুমে স্থানান্তরিত হয়ে থাকতে পারে। প্রশাসনিক সীমানা পরিবর্তনের কারণেও কোনো এলাকার পুরনো রেকর্ড ভিন্ন অফিসে থাকতে পারে।

মূল দলিল উদ্ধার করা গেলেও সার্টিফাইড নকল সংগ্রহ করে আলাদা জায়গায় সংরক্ষণ করে রাখার অভ্যাস ভবিষ্যতের ঝুঁকি কমায়। ডিজিটাল স্ক্যান কপি রাখাও সহায়ক, যদিও তার আইনি মর্যাদা সার্টিফাইড নকলের সমান নয়।

ট্যাগ: দলিল হারিয়ে গেলে নকল দলিল সার্টিফাইড কপি বালাম বই তল্লাশ ফি সাব রেজিস্ট্রি অফিস কোর্ট ফি
শেয়ার করুন:
সহায়তা প্রয়োজন?
১৬১২২
সেবা সমূহ