সিএস, এসএ, আরএস ও বিএস খতিয়ানের পার্থক্য এবং কোনটি কখন প্রযোজ্য
জমি কিনতে গিয়ে অনেকেই বিভ্রান্ত হন যখন দেখা যায় একই জমির জন্য একাধিক খতিয়ান বিদ্যমান এবং সেগুলোতে দাগ নম্বর ও জমির পরিমাণ ভিন্ন। এর কারণ সহজ — বাংলাদেশে বিভিন্ন সময়ে একাধিক ভূমি জরিপ পরিচালিত হয়েছে এবং প্রতিটি জরিপের ফলাফল আলাদা খতিয়ান হিসেবে সংরক্ষিত। কোন খতিয়ানটি বর্তমানে প্রযোজ্য, তা নির্ভর করে সংশ্লিষ্ট এলাকায় সর্বশেষ কোন জরিপ সম্পন্ন হয়েছে তার উপর।
একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতি হলো — সাধারণভাবে সর্বশেষ সম্পন্ন জরিপের রেকর্ডই বর্তমান রেকর্ড হিসেবে বিবেচিত হয়। পুরনো খতিয়ান তখন ঐতিহাসিক নথি হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ থাকে, বিশেষত মালিকানার ধারাবাহিকতা প্রমাণে, কিন্তু বর্তমান অবস্থা নির্দেশ করে না।
চারটি প্রধান জরিপ
| খতিয়ান | পূর্ণরূপ | আনুমানিক সময়কাল | বৈশিষ্ট্য |
|---|---|---|---|
| সিএস | ক্যাডাস্ট্রাল সার্ভে | ১৮৮৮–১৯৪০ | উপমহাদেশের প্রথম পূর্ণাঙ্গ জরিপ; ভিত্তি নথি হিসেবে বিবেচিত |
| এসএ | স্টেট অ্যাকুইজিশন সার্ভে | ১৯৫৬–১৯৬২ | জমিদারি উচ্ছেদের পর প্রজাস্বত্ব নির্ধারণে প্রস্তুত |
| আরএস | রিভিশনাল সার্ভে | ১৯৬৫ থেকে পরবর্তী সময় | এসএ রেকর্ডের ভুল সংশোধনের লক্ষ্যে পরিচালিত |
| বিএস / বিআরএস | বাংলাদেশ সার্ভে | ১৯৯০-এর দশক থেকে চলমান | সর্বাধুনিক জরিপ; অনেক এলাকায় এখনো চলমান |
উল্লেখ্য, ঢাকা ও কিছু এলাকায় আরএস-এর পরিবর্তে বা অতিরিক্ত হিসেবে অন্য নামে জরিপ পরিচিত, এবং সব এলাকায় চারটি জরিপই সম্পন্ন হয়নি। তাই নির্দিষ্ট জমির ক্ষেত্রে কোন কোন খতিয়ান বিদ্যমান, তা সংশ্লিষ্ট ভূমি অফিস থেকে যাচাই করে নিতে হয়।
সিএস খতিয়ানের ঐতিহাসিক গুরুত্ব
সিএস জরিপ ব্রিটিশ আমলে পরিচালিত প্রথম বৈজ্ঞানিক ভূমি জরিপ। এতে প্রতিটি মৌজার নকশা প্রস্তুত করা হয় এবং প্রতিটি দাগের জন্য মালিক, দখলদার ও জমির শ্রেণি লিপিবদ্ধ করা হয়। মালিকানার ধারাবাহিকতা অনেক ক্ষেত্রে সিএস খতিয়ান থেকেই শুরু করে মেলানো হয়, কারণ এর আগের রেকর্ড সাধারণত সুসংগঠিত নয়।
তবে সিএস খতিয়ানে জমিদারি ব্যবস্থার প্রতিফলন রয়েছে — সেখানে জমিদার ও প্রজার সম্পর্ক লিপিবদ্ধ। ১৯৫০ সালের রাষ্ট্রীয় অধিগ্রহণ ও প্রজাস্বত্ব আইনের মাধ্যমে জমিদারি বিলুপ্ত হওয়ার পর এই সম্পর্কের আইনগত ভিত্তি পাল্টে যায়।
এসএ খতিয়ান নিয়ে প্রচলিত ভুল ধারণা
এসএ জরিপ সম্পন্ন হয়েছিল মূলত জমিদারি প্রথা বিলোপের পর প্রজাস্বত্ব ও মালিকানা নির্ধারণের উদ্দেশ্যে। এ ক্ষেত্রে অনেকাংশে পূর্ববর্তী রেকর্ড ও মালিকদের ঘোষণার উপর নির্ভর করা হয়েছিল, সরেজমিন যাচাই তুলনামূলকভাবে সীমিত ছিল। ফলে এসএ রেকর্ডে ভুল থাকার প্রবণতা বেশি লক্ষ করা যায়।
এ কারণেই পরবর্তীতে আরএস জরিপ পরিচালিত হয়, যার মূল উদ্দেশ্যই ছিল এসএ রেকর্ডের ত্রুটি সংশোধন। যেসব এলাকায় আরএস বা বিএস সম্পন্ন হয়েছে, সেখানে এসএ খতিয়ান ঐতিহাসিক নথি হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ হলেও বর্তমান রেকর্ড হিসেবে প্রযোজ্য নয়। অথচ বাস্তবে দেখা যায়, অনেকে এখনো এসএ খতিয়ান দেখিয়ে জমির দাবি উপস্থাপন করেন।
খতিয়ানে যেসব তথ্য থাকে
- খতিয়ান নম্বর — সংশ্লিষ্ট হোল্ডিংয়ের ক্রমিক শনাক্তকারী
- মৌজার নাম ও জেএল নম্বর — জমির ভৌগোলিক অবস্থান নির্দেশক
- দাগ নম্বর — মৌজা ম্যাপে নির্দিষ্ট প্লটের শনাক্তকারী
- জমির পরিমাণ — শতক বা একরে, দাগভিত্তিক
- জমির শ্রেণি — নাল, ভিটি, ডোবা, বাগান প্রভৃতি
- মালিকের নাম ও পিতার নাম — একাধিক মালিক থাকলে প্রত্যেকের নাম
- হিস্যা — যৌথ মালিকানায় প্রত্যেকের আনুপাতিক অংশ
জমি যাচাইয়ে খতিয়ানের ধারাবাহিকতা
জমি ক্রয়ের আগে কেবল সর্বশেষ খতিয়ান দেখাই যথেষ্ট বিবেচিত হয় না। মালিকানার ধারাবাহিকতা যাচাইয়ের জন্য পুরনো খতিয়ান থেকে সর্বশেষ খতিয়ান পর্যন্ত সূত্র মিলিয়ে দেখার রীতি প্রচলিত। বিশেষভাবে যাচাই করা হয়:
- পুরনো ও নতুন খতিয়ানে দাগ নম্বর কীভাবে পরিবর্তিত হয়েছে
- জমির পরিমাণে গরমিল আছে কি না এবং থাকলে তার সম্ভাব্য কারণ
- প্রতিটি হস্তান্তরের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট দলিল ও নামজারি বিদ্যমান কি না
- খতিয়ানে একাধিক অংশীদার থাকলে প্রত্যেকের হিস্যা কীভাবে লেখা আছে
- জমির শ্রেণি পরিবর্তিত হয়েছে কি না
এক জরিপ থেকে আরেক জরিপে দাগ নম্বর পরিবর্তিত হওয়া স্বাভাবিক ঘটনা। দাগ মিলছে না দেখেই জমি ভিন্ন — এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর আগে মৌজা ম্যাপের সঙ্গে মিলিয়ে অবস্থান যাচাই করার প্রয়োজন পড়ে।
চলমান জরিপে আপত্তি দাখিলের সুযোগ
বিএস জরিপ চলমান এলাকায় প্রক্রিয়াটি কয়েকটি পর্যায়ে সম্পন্ন হয় — সীমানা নির্ধারণ, নকশা প্রস্তুত, খসড়া খতিয়ান প্রকাশ, আপত্তি গ্রহণ ও নিষ্পত্তি, এবং চূড়ান্ত প্রকাশ। খসড়া খতিয়ান প্রকাশের পর নির্ধারিত সময়ের মধ্যে আপত্তি দাখিলের সুযোগ থাকে।
এই পর্যায়ে আপত্তি নিষ্পত্তি করা তুলনামূলকভাবে সহজ ও কম ব্যয়বহুল। চূড়ান্ত প্রকাশের পর রেকর্ড সংশোধনের জন্য আদালতে যেতে হয়, যা দীর্ঘ ও ব্যয়সাপেক্ষ প্রক্রিয়া। তাই জরিপ চলাকালীন খসড়া রেকর্ড যাচাই করে নেওয়া এবং ভুল থাকলে সময়মতো আপত্তি দাখিল করা গুরুত্বপূর্ণ।
জরিপ চলাকালে জমির মালিক বা তাঁর প্রতিনিধির উপস্থিত থাকা এবং সীমানা চিহ্নিতকরণে অংশ নেওয়া বাঞ্ছনীয়। অনুপস্থিতির কারণে প্রতিবেশীর দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে সীমানা নির্ধারিত হয়ে গেলে পরে তা সংশোধন করানো কঠিন হয়ে পড়ে।