নাবালকের সম্পত্তি ও অভিভাবকত্ব: হস্তান্তরের সীমা ও আদালতের অনুমতি
উত্তরাধিকারসূত্রে কিংবা দানসূত্রে নাবালকের নামে জমি থাকা সাধারণ ঘটনা। পিতার মৃত্যুর পর অপ্রাপ্তবয়স্ক সন্তানরা ওয়ারিশ হিসেবে অংশ পান, কিংবা দাদা-দাদি নাতি-নাতনির নামে সম্পত্তি দান করেন। কিন্তু নাবালকের নামে থাকা সম্পত্তি আইনের চোখে বিশেষ সুরক্ষার আওতায় পড়ে, এবং তা সাধারণ সম্পত্তির মতো অবাধে হস্তান্তরযোগ্য নয়।
এই সুরক্ষার কারণ স্পষ্ট — নাবালক নিজের স্বার্থ রক্ষার সিদ্ধান্ত নিতে আইনত সক্ষম নন। ফলে তাঁর পক্ষে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা যাঁকে দেওয়া হয়, সেই ক্ষমতার উপরও নিয়ন্ত্রণ আরোপ করা হয়েছে।
অভিভাবকত্বের ধরন
| ধরন | কে হন | ক্ষমতার পরিধি |
|---|---|---|
| স্বাভাবিক অভিভাবক | সাধারণত পিতা, তাঁর অবর্তমানে নির্ধারিত ক্রমে | দৈনন্দিন ব্যবস্থাপনা |
| আদালত নিযুক্ত অভিভাবক | আদালতের আদেশে নিযুক্ত ব্যক্তি | আদেশে নির্ধারিত পরিধি |
| অছিয়তনামায় নিযুক্ত | অছিয়তে মনোনীত ব্যক্তি | অছিয়তে উল্লিখিত পরিধি |
গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, স্বাভাবিক অভিভাবক হওয়া মানেই সম্পত্তি হস্তান্তরের অধিকার পাওয়া নয়। দৈনন্দিন ব্যবস্থাপনা, যেমন জমি চাষে দেওয়া বা কর পরিশোধ, আর স্থাবর সম্পত্তি বিক্রি — দুটি সম্পূর্ণ ভিন্ন মাত্রার কাজ।
হস্তান্তরে আদালতের অনুমতি
অভিভাবক ও প্রতিপাল্য আইন, ১৮৯০ অনুযায়ী নাবালকের স্থাবর সম্পত্তি হস্তান্তরের জন্য আদালতের পূর্বানুমতি প্রয়োজন। অনুমতি ছাড়া সম্পাদিত হস্তান্তর পরবর্তীতে চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে পারে।
আদালত অনুমতি দেওয়ার সময় মূলত একটি প্রশ্নই বিবেচনা করেন — হস্তান্তরটি নাবালকের স্বার্থে হচ্ছে কি না। সাধারণত যেসব কারণ বিবেচিত হয়:
- নাবালকের চিকিৎসা বা শিক্ষার অপরিহার্য ব্যয়
- নাবালকের ভরণপোষণের প্রয়োজন
- সম্পত্তির উপর থাকা ঋণ পরিশোধ
- সম্পত্তি সংরক্ষণে প্রয়োজনীয় ব্যয়
- হস্তান্তর করে অধিক লাভজনক সম্পত্তি অর্জন
অনুমতির আবেদনে সাধারণত উল্লেখ করতে হয় কেন হস্তান্তর প্রয়োজন, প্রাপ্ত অর্থ কীভাবে ব্যবহৃত হবে, এবং প্রস্তাবিত মূল্য যুক্তিসঙ্গত কি না। আদালত প্রয়োজনে প্রাপ্ত অর্থ নাবালকের নামে জমা রাখার শর্ত আরোপ করতে পারেন।
ক্রেতার ঝুঁকি
নাবালকের সম্পত্তি ক্রয়ে ক্রেতার জন্য একটি দীর্ঘমেয়াদি ঝুঁকি রয়েছে। আদালতের অনুমতি ছাড়া হস্তান্তর হয়ে থাকলে নাবালক সাবালক হওয়ার পর সেই হস্তান্তর চ্যালেঞ্জ করতে পারেন। অর্থাৎ ঝুঁকিটি লেনদেনের অনেক বছর পরেও সক্রিয় থাকতে পারে।
এ কারণে এ ধরনের জমি ক্রয়ের আগে যা যাচাই করার রীতি প্রচলিত:
- বিক্রেতা আইনত অভিভাবক হিসেবে স্বীকৃত কি না
- আদালতের অনুমতির আদেশ রয়েছে কি না এবং তা সংশ্লিষ্ট সম্পত্তির জন্যই কি না
- অনুমতিতে কোনো শর্ত আরোপিত আছে কি না
- নাবালকের বয়স ও সাবালক হওয়ার সম্ভাব্য সময়
- একাধিক নাবালক ওয়ারিশ থাকলে প্রত্যেকের অংশের জন্য অনুমতি নেওয়া হয়েছে কি না
নাবালকের অংশসহ যৌথ সম্পত্তি হস্তান্তরের ক্ষেত্রে অনেকে কেবল সাবালক শরিকদের সম্মতি নিয়েই লেনদেন সম্পন্ন করেন। নাবালকের অংশের জন্য আলাদা অনুমতি না থাকলে সেই অংশের হস্তান্তর পরবর্তীতে প্রশ্নবিদ্ধ হতে পারে।