মুসলিম উত্তরাধিকার আইন: ফারায়েজের মূল নীতি ও নির্ধারিত অংশ
মুসলিম উত্তরাধিকার আইনে সম্পত্তি বণ্টনের নিয়ম নির্দিষ্ট ও বিস্তারিতভাবে নির্ধারিত। এই বণ্টন পদ্ধতি ফারায়েজ নামে পরিচিত। এর একটি মৌলিক বৈশিষ্ট্য হলো, মৃত ব্যক্তির ইচ্ছার উপর সম্পূর্ণ বণ্টন নির্ভর করে না — ওয়ারিশদের অংশ আইনেই নির্ধারিত, এবং সেই অংশ পরিবর্তন করার সুযোগ সীমিত।
বাংলাদেশে মুসলিম উত্তরাধিকার পরিচালিত হয় প্রচলিত মুসলিম আইন এবং মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশ, ১৯৬১-এর আলোকে। সম্পত্তি বণ্টনের আগে মৃত ব্যক্তির দাফন-কাফনের খরচ, ঋণ পরিশোধ এবং অছিয়ত থাকলে তা সম্পাদনের বিধান রয়েছে; অবশিষ্ট সম্পত্তিই ওয়ারিশদের মধ্যে বণ্টিত হয়।
দুই শ্রেণির ওয়ারিশ
ফারায়েজে ওয়ারিশদের প্রধানত দুই শ্রেণিতে ভাগ করা হয়।
- নির্ধারিত অংশভোগী — যাঁদের অংশ আইনে নির্দিষ্ট ভগ্নাংশে বলা আছে, যেমন স্ত্রী, স্বামী, মা, পিতা ও কন্যা
- অবশিষ্টাংশভোগী বা আসাবা — নির্ধারিত অংশ বণ্টনের পর যা অবশিষ্ট থাকে তা যাঁরা পান, সাধারণত পুত্র ও পুরুষ আত্মীয়রা
বণ্টনের ক্রম হলো — প্রথমে নির্ধারিত অংশভোগীরা তাঁদের অংশ পান, তারপর অবশিষ্ট সম্পত্তি আসাবাদের মধ্যে বণ্টিত হয়। কোনো আসাবা না থাকলে নির্দিষ্ট শর্তে নির্ধারিত অংশভোগীদের অংশ আনুপাতিকভাবে বৃদ্ধি পেতে পারে।
কয়েকটি নির্ধারিত অংশ
| ওয়ারিশ | অবস্থা | নির্ধারিত অংশ |
|---|---|---|
| স্ত্রী | সন্তান বা পুত্রের সন্তান থাকলে | এক-অষ্টমাংশ |
| স্ত্রী | সন্তান না থাকলে | এক-চতুর্থাংশ |
| স্বামী | সন্তান বা পুত্রের সন্তান থাকলে | এক-চতুর্থাংশ |
| স্বামী | সন্তান না থাকলে | অর্ধেক |
| মা | সন্তান বা একাধিক ভাইবোন থাকলে | এক-ষষ্ঠাংশ |
| পিতা | সন্তান থাকলে | এক-ষষ্ঠাংশ |
| কন্যা | একমাত্র কন্যা, পুত্র নেই | অর্ধেক |
| কন্যা | একাধিক কন্যা, পুত্র নেই | দুই-তৃতীয়াংশ, সমানভাবে বণ্টিত |
একাধিক স্ত্রী থাকলে নির্ধারিত অংশ তাঁদের মধ্যে সমানভাবে বণ্টিত হয়। পুত্র থাকলে কন্যারা নির্ধারিত অংশভোগী থাকেন না, বরং পুত্রদের সঙ্গে আসাবা হিসেবে অংশ পান — সেখানে এক পুত্রের বিপরীতে এক কন্যা অর্ধেক অংশ পান।
এতিম নাতি-নাতনির অধিকার
প্রচলিত মুসলিম আইনে পিতার জীবদ্দশায় কোনো সন্তান মারা গেলে সেই সন্তানের সন্তানরা দাদার সম্পত্তিতে অংশ পেতেন না, কারণ মধ্যবর্তী স্তরের ওয়ারিশ অনুপস্থিত। মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশ, ১৯৬১-এর মাধ্যমে এই অবস্থার পরিবর্তন আনা হয়।
বর্তমান বিধান অনুযায়ী, পূর্বে মৃত সন্তানের সন্তানরা প্রতিনিধিত্বমূলকভাবে সেই অংশ পান যা তাঁদের পিতা বা মাতা জীবিত থাকলে পেতেন। এই বিধান বাংলাদেশে বহু পরিবারের বণ্টনে সরাসরি প্রযোজ্য।
অছিয়তের সীমা
মৃত্যুর পর কার্যকর হবে এমন ইচ্ছাপত্র বা অছিয়তের মাধ্যমে সম্পত্তির একটি সীমিত অংশ ওয়ারিশ নন এমন ব্যক্তিকে দেওয়া যায়। প্রচলিত বিধান অনুযায়ী এই সীমা মোট সম্পত্তির এক-তৃতীয়াংশ, এবং ওয়ারিশদের অনুকূলে অছিয়তের ক্ষেত্রে অন্য ওয়ারিশদের সম্মতির প্রশ্ন আসে।
এ কারণে জীবদ্দশায় সম্পত্তি বণ্টনের ইচ্ছা থাকলে অনেকে অছিয়তের বদলে হেবা বা দানপত্রের পথ বেছে নেন, কারণ সেখানে হস্তান্তর তাৎক্ষণিকভাবে কার্যকর হয় এবং ফারায়েজের সীমা প্রযোজ্য হয় না।
প্রচলিত ভুল ধারণা
- কন্যারা সম্পত্তি পান না — বাস্তবে কন্যাদের অংশ আইনে নির্দিষ্টভাবে স্বীকৃত
- বিধবা স্ত্রী কেবল ভরণপোষণ পান — বাস্তবে তিনি নির্ধারিত অংশের মালিক হন
- মৌখিক বণ্টনই যথেষ্ট — বাস্তবে রেকর্ডে নামজারি না হলে পরবর্তী প্রজন্মে জটিলতা তৈরি হয়
- বড় ছেলে সব দায়িত্ব নিলে বেশি অংশ পান — ফারায়েজে এমন কোনো বিধান নেই
ফারায়েজের প্রকৃত হিসাব নির্ভর করে জীবিত ওয়ারিশদের সুনির্দিষ্ট সংমিশ্রণের উপর, এবং একজন ওয়ারিশের উপস্থিতি অন্যজনের অংশ বদলে দিতে পারে। জটিল ক্ষেত্রে অভিজ্ঞ আইনজীবী বা আলেমের মাধ্যমে হিসাব নির্ধারণ করিয়ে নেওয়ার রীতি প্রচলিত।