ভূমি উন্নয়ন কর রেয়াত ও ব্যতিক্রম: কারা ছাড় পান এবং কোন শর্তে
ভূমি উন্নয়ন কর সব জমিতে সমানভাবে প্রযোজ্য নয়। ব্যক্তি বা পরিবারভিত্তিক কৃষি জমিতে ২৫ বিঘা পর্যন্ত মওকুফের বিধানটি সর্বাধিক পরিচিত, কিন্তু এর বাইরেও কয়েকটি শ্রেণির জমিতে রেয়াত বা ব্যতিক্রম প্রযোজ্য হতে পারে। এসব ব্যতিক্রম সাধারণত জমির ব্যবহারের প্রকৃতি বিবেচনায় দেওয়া হয় — অর্থাৎ জমিটি বাণিজ্যিক মুনাফার উদ্দেশ্যে নয়, বরং জনকল্যাণমূলক বা ধর্মীয় কাজে ব্যবহৃত হচ্ছে কি না।
গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, রেয়াত স্বয়ংক্রিয় নয়। প্রায় সব ক্ষেত্রেই আবেদন করে, প্রমাণ দাখিল করে এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অনুমোদন নিয়ে তা কার্যকর করতে হয়। আবেদন না করলে রেকর্ডে জমি সাধারণ শ্রেণিতেই থেকে যায় এবং কর আরোপিত হতে থাকে।
কৃষি জমির সাধারণ মওকুফ
ব্যক্তি বা পরিবারভিত্তিক মোট কৃষি জমির পরিমাণ ২৫ বিঘা বা ৮.২৫ একর পর্যন্ত হলে ভূমি উন্নয়ন কর মওকুফ। আখ ও লবণ চাষের জমি এবং বাণিজ্যিক নয় এমন পারিবারিক পুকুরও এই সুবিধার আওতায় পড়ে। মওকুফপ্রাপ্ত হলেও বার্ষিক ১০ টাকা হারে দাখিলা ফি পরিশোধ করতে হয়।
এই মওকুফের দুটি সীমা মনে রাখার মতো। প্রথমত, হিসাব হয় পরিবারভিত্তিক মোট জমির উপর — একাধিক মৌজা বা জেলায় ছড়িয়ে থাকা জমির যোগফল ধরা হয়। দ্বিতীয়ত, সীমা অতিক্রম করলে কেবল অতিরিক্ত অংশ নয়, সম্পূর্ণ জমিই করের আওতায় আসে।
যেসব ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম বিবেচিত হয়
জনকল্যাণমূলক ও ধর্মীয় ব্যবহারের জমিতে সাধারণত ছাড় বিবেচিত হয়। প্রচলিত শ্রেণিগুলো:
- মসজিদ, মন্দির, গির্জা, প্যাগোডা ও অন্যান্য উপাসনালয়ের জমি
- কবরস্থান ও শ্মশানের জমি
- সরকারি ও এমপিওভুক্ত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের জমি
- সরকারি হাসপাতাল ও দাতব্য চিকিৎসা প্রতিষ্ঠানের জমি
- সরকারি ও আধা-সরকারি প্রতিষ্ঠানের নির্দিষ্ট শ্রেণির জমি
- রাস্তা, খাল ও জনসাধারণের ব্যবহারের জমি
এসব ক্ষেত্রে ছাড়ের শর্ত হলো জমিটি প্রকৃতপক্ষে সেই উদ্দেশ্যেই ব্যবহৃত হচ্ছে কি না। উপাসনালয়ের নামে জমি থাকলেও তা যদি বাণিজ্যিকভাবে ভাড়া দেওয়া হয় বা দোকান নির্মিত হয়, তাহলে সেই অংশের ক্ষেত্রে ছাড়ের যুক্তি দুর্বল হয়ে পড়ে।
বাণিজ্যিক কৃষিতে ছাড় প্রযোজ্য নয়
একটি সাধারণ ভুল ধারণা হলো, জমি কৃষিকাজে ব্যবহৃত হলেই মওকুফ পাওয়া যায়। বাস্তবে বাণিজ্যিক প্রকৃতির কৃষি কার্যক্রম — চা, কফি, রাবার, ফুল ও ফলের বাণিজ্যিক বাগান, বাণিজ্যিক মৎস্য ও চিংড়ি চাষ, পোলট্রি ও পশুপালন — মওকুফের আওতায় পড়ে না। এসব ক্ষেত্রে প্রতি শতাংশ ২ টাকা হারে কর প্রযোজ্য।
একইভাবে প্রতিষ্ঠানের নামে থাকা কৃষি জমিতেও ব্যক্তি বা পরিবারভিত্তিক মওকুফ প্রযোজ্য হয় না।
রেয়াত নিশ্চিত করার প্রক্রিয়া
- সংশ্লিষ্ট ইউনিয়ন বা উপজেলা ভূমি অফিসে আবেদন দাখিল করা হয়।
- জমির খতিয়ান ও প্রতিষ্ঠানের নিবন্ধন সংক্রান্ত কাগজপত্র সংযুক্ত করা হয়।
- জমিটি দাবিকৃত উদ্দেশ্যেই ব্যবহৃত হচ্ছে মর্মে প্রমাণ দাখিল করা হয়।
- ইউনিয়ন ভূমি সহকারী কর্মকর্তা সরেজমিন যাচাই করে প্রতিবেদন দেন।
- অনুমোদনের পর রেকর্ডে ছাড়ের বিষয়টি প্রতিফলিত হয়।
অনুমোদন পাওয়ার পরও পর্যায়ক্রমে যাচাই হতে পারে। ব্যবহারের প্রকৃতি বদলে গেলে ছাড় প্রত্যাহারের প্রশ্ন আসে, এবং সে ক্ষেত্রে পরিবর্তনের সময় থেকে বকেয়া কর নির্ধারিত হতে পারে।
ছাড় পাওয়া জমির ক্ষেত্রেও রেকর্ড হালনাগাদ রাখা ও প্রয়োজনীয় দাখিলা সংগ্রহ করে রাখার রীতি প্রচলিত, কারণ এটি জমির সঙ্গে প্রতিষ্ঠানের সম্পর্কের ধারাবাহিক প্রমাণ তৈরি করে।